সবাই যখন বলেছিল পারব না, তখন কীভাবে শুরু করেছিলাম
আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা শুরু হয়েছিল তখন, যখন সবাই খুব স্পষ্ট করে আমাকে একটা কথাই বলছিল—“তুই পারবি না।” কথাটা হয়তো ছোট, কিন্তু তার ওজন অদ্ভুতভাবে ভারী। তখন মনে হতো, পৃথিবী বুঝি সবাই মিলে আমাকে একটা দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখছে, আর আমি সেই দেয়ালের ওপারে কী আছে তা দেখতেও পাচ্ছি না।
আমি কী করতে চাই, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু সেটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা। কারণ আশেপাশের সবাই মনে করত, এটা একধরনের পাগলামী। কেউ বলত, “এসব বাংলাদেশে হয় না।” কেউ বা বলত, “এত সহজ হলে সবাই করত।” সবচেয়ে কাছের মানুষও যখন এমন কথা বলে, তখন ব্যাপারটা কষ্টের থেকেও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
একদিন এক আত্মীয় সরাসরি বলেই দিল, “তোর মতো लड़ারা এসব স্বপ্ন দেখে, কিন্তু শেষমেশ কোথাও গিয়ে থেমে যায়।” সেই কথাটা রাতে ঘুম ভেঙে ফিরেও মনে হচ্ছিল কেউ কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলছে—পারবি না।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ওই কথাটাই ছিল আমার প্রথম শক্তি।
আমি কি তখন খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম? না। বরং সত্যি কথা বলতে, তখন আমি ভয়েই কাঁপছিলাম। নিজের প্রতি বিশ্বাস খুব কম ছিল। কিন্তু একটা ব্যাপার বিশ্বাস করতাম—“ভুল হলেও নিজের চেষ্টাটা অন্তত করবো, কারণ হেরে গেলেও এই আফসোসটা থাকবে না যে আমি চেষ্টা করিনি।”
সেদিন রাতে আমি টেবিলে কলম আর একটা পুরনো খাতা নিয়ে বসেছিলাম। খাতার প্রথম পাতায় লিখলাম—“আমি শুরু করছি।”
হাস্যকর শোনালেও, সেই কথাটাই আমার পথচলাকে সত্যি করেছিল।
শুরুর দিনগুলো খুব সুন্দর ছিল না। বরং ভয়ংকর। মনে আছে, প্রথম যে কাজটা করলাম, সেটা ভুল ছিল। আমি যা তৈরি করছিলাম, সেটা মানুষ একটুও পছন্দ করেনি। বন্ধুদের দেখালাম, তারা কিছু না বলে শুধু হেসে বলল, “এইটা দিয়ে কী হবে?”
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে আমি কাঁদিনি, কিন্তু মনটা ভেঙে যাওয়ার শব্দ আমি নিজেই শুনেছিলাম।
তবুও পরের দিন সকালে উঠে আবার বসেছিলাম। কেন জানো? কারণ একটা কথা মনে হয়েছিল—“আমি যদি আজকে হাল ছেড়ে দিই, তাহলে কালকে আবার সবাই বলবে—দেখেছিস, আমরা তো আগেই বলেছিলাম।”
আমি চাইনি, তাদের কথাটা সত্যি হোক।
আমার চারপাশে যারা আমাকে নিরুৎসাহ করত, তাদের কথায় অসত্য কিছু ছিল না। হ্যাঁ, আমার কাছে টাকা ছিল না। অভিজ্ঞতা ছিল না। কোনো গাইডলাইন ছিল না। কিন্তু একটা জিনিস ছিল—অতিরিক্ত সাহস নয়, অতিরিক্ত জেদ।
বিপদের সময় বিশ্বাস করো, জেদ অনেক সময় সঠিক জায়গায় কাজ করে।
আমি ইন্টারনেট থেকে শিখতে শুরু করলাম। ফ্রি কোর্স, ইউটিউব ভিডিও, ব্লগ… যা পাই, তা দিয়েই শুরু করলাম। রাত জেগে পড়তাম। কখনো মনে হতো, কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু লেগে থাকতাম।
একদিন বুঝতে পারলাম, শেখা আর করা—দুইটা আলাদা জিনিস। তাই শিখে বসে থাকিনি, ছোট ছোট কাজ করা শুরু করলাম। কেউ দেখুক বা না দেখুক, আমি নিজের কাজ নিজেই করতাম, আবার নিজেই ভুলও ধরতাম।
কেউ হাততালি দিত না, কেউ সাহস দিত না—তবু আমি করতাম।
একটা সময় এসে আমি বুঝলাম, মানুষ তখনই বিশ্বাস করে যখন তুমি নিজের কাজ দিয়ে প্রমাণ করো। কথা দিয়ে না।
সেই প্রথমবার, কেউ একজন আমার কাজ দেখে বলেছিল, “তুই আস্তে আস্তে পারবেনুজ্জ্বল একটা কিছু করছিস। চালিয়ে যা।”
এই একটাই লাইন আমাকে আবার নতুন করে শক্তি দিয়েছিল।
মজার ব্যাপার হলো, যেদিন প্রথম আমি সামান্য কিছু আয় করলাম নিজের কাজ দিয়ে, আমার হাত কাঁপছিল। খুব বেশি টাকা ছিল না, কিন্তু সেটা ছিল আমার নিজের। কাউকে বলতে হয়নি, কেউ দয়া করে দেয়নি। এটা অর্জন, যা বলার মতো ছোট হলেও অনুভূতির দিক থেকে বিশাল।
তখনো সবাই আমাকে সমর্থন করছিল না। কিন্তু আগের মতো বিরোধিতা করছিল না। কারণ তারা দেখেছে, আমি থামিনি।
আমি ধীরে ধীরে শিখলাম—
জীবনে সবাই তোমাকে বিশ্বাস করবে, এমনটা কখনোই না। কিন্তু তুমি যদি নিজের স্বপ্নের প্রতি সত্যি থাকতে পারো, ধৈর্য নিয়ে—তাহলে একদিন তাদের নীরবতা নিজের মতো করে বদলে যায়।
আর হ্যাঁ—
“পারবি না” কথাটা আজও আমি মাঝে মাঝে শুনি। কিন্তু আজ আর সেটা আমাকে থামাতে পারে না। বরং মনে করিয়ে দেয়—কতদূর এসেছি, কত পথ এখনো বাকি।
জীবনে সফল হওয়ার জন্য সবার সমর্থন প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় নিজের লক্ষ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার সাহস, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। মানুষ হয়তো প্রথমে বলবে “পারবি না”, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আপনার কাজই তাদের উত্তর হয়ে দাঁড়াবে। তাই স্বপ্ন যদি সত্যিই আপনার হয়, তাহলে শুরু করুন। কারণ বড় অর্জনের গল্পগুলোও একদিন ছোট একটি সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয়েছিল।